শিখ ধর্ম এক ইশ্বরে বিশ্বাসী
শিখ ধর্মের জন্ম এমন এক সময়ে, যখন ভারত উপমহাদেশ গভীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। হিন্দু ও মুসলমান সমাজের মধ্যে আচার, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে ঘিরে যে টানাপোড়েন চলছিল, তার ভেতরেই শিখ ধর্ম একটি ভিন্ন পথের কথা বলে—যেখানে ধর্ম মানে আচারগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং নৈতিক জীবন ও মানবিক মর্যাদা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবের জন্ম ১৪৬৯ সালে বর্তমান পাকিস্তানের নানকানা সাহিবে। সে সময় উত্তর ভারতে একদিকে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক কাঠামো, অন্যদিকে মুসলিম শাসনের অধীনে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ক্ষমতার বলয় সক্রিয় ছিল। সাধারণ মানুষের জন্য ধর্মীয় জীবন হয়ে উঠেছিল বিভাজন ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্র।
এই প্রেক্ষাপটে গুরু নানক একেশ্বরবাদী বিশ্বাস প্রচার করেন, কিন্তু তিনি নিজেকে হিন্দু বা মুসলমান—কোনোটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ, “না হিন্দু, না মুসলমান”—মূলত ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা।
বিশ্বাস ও দর্শনের মূল কাঠামো
শিখ ধর্মের কেন্দ্রে রয়েছে এক ঈশ্বরের বিশ্বাস, যিনি নিরাকার ও সর্বব্যাপী। শিখ দর্শনে ঈশ্বরপ্রাপ্তির জন্য যজ্ঞ, তীর্থ বা ধর্মীয় মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। বরং সত্যবাদিতা, শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা ও মানবসেবাই ঈশ্বরস্মরণের পথ।
শিখ ধর্মের প্রধান নীতিগুলো সংক্ষেপে—
- একেশ্বরবাদ
- কিরত করো (পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা)
- নাম জপো (ঈশ্বরস্মরণ)
- বন্দ ছকো (অর্জিত সম্পদ ভাগাভাগি)
- বর্ণভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের বিরোধিতা
গুরুপরম্পরা ও ধর্মীয় গঠন
গুরু নানকের পর আরও নয়জন গুরু শিখ ধর্মকে ধাপে ধাপে সংগঠিত করেন। এই সময়েই শিখ সম্প্রদায় একটি নৈতিক আন্দোলন থেকে সুসংহত সামাজিক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
শিখ ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহিব কেবল শিখ গুরুদের বাণী নয়; এতে হিন্দু ভক্ত কবি ও মুসলিম সুফি সাধকদের রচনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি শিখ ধর্মের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বয়বাদী চরিত্রকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সংঘাত ও আত্মরক্ষার বাস্তবতা
মধ্যযুগের রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিখ সম্প্রদায় নিপীড়নের মুখোমুখি হয়। গুরু অর্জন দেব ও গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুকে শিখ ইতিহাসে ধর্মীয় সহনশীলতার মূল্য হিসেবে দেখা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে দশম গুরু গুরু গোবিন্দ সিং ১৬৯৯ সালে খালসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি শিখদের একটি নৈতিক–সামাজিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আত্মরক্ষার সক্ষম গোষ্ঠীতে রূপ দেয়। খালসার পাঁচ ক—কেশ, কঙ্গা, কচ্ছা, কড়া ও কৃপাণ—শিখ পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে।
শিখ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রচিন্তা
উনিশ শতকে মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের নেতৃত্বে পাঞ্জাবে শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শাসনামলে ধর্মীয় সহনশীলতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের দৃষ্টান্ত দেখা যায়। মসজিদ, মন্দির ও গুরুদ্বার সমানভাবে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পায়।
ঔপনিবেশিক যুগ ও পরিচয়ের রূপান্তর
ব্রিটিশ শাসনামলে শিখরা সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে শিখ পরিচয় আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির সম্পর্ক এখানে নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়।
সমকালীন প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
আজ শিখ ধর্ম একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। লঙ্গর প্রথা—যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে আহার করে—সমতার একটি কার্যকর উদাহরণ।
তবে আধুনিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন কখনো কখনো শিখ ধর্মের মূল সমন্বয়বাদী ও মানবিক দর্শনকে ছাপিয়ে যায়। এই দ্বন্দ্ব—নৈতিক ধর্মচিন্তা বনাম রাজনৈতিক পরিচয়—আজকের শিখ সমাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার
শিখ ধর্ম মূলত সংঘাতের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া এক সমন্বয়বাদী বিশ্বাস। এটি ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং নৈতিকতা ও মানবিক মর্যাদাকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়েছে। মধ্যযুগীয় ভারতের বিভক্ত সমাজে এই দর্শন যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজকের বিভক্ত বিশ্বেও তেমনি তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আরও পড়ুনঃ







Leave a Reply